017574823_30300

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানির যাত্রা শুরু“ হয়েছিল ১৯৭৬-৭৭ অর্থবছরে। মাত্র ৭ হাজার মার্কিন ডলার রফতানি হয়েছিল সে বছর। সাহসী উদ্যোক্তা এবং সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে পরবর্তী দেড় দশকে খাতটির তেমন অগ্রগতি হয়নি। ১৯৮৯-৯০ অর্থবছরে আয় হয়েছে মাত্র ৬২ কোটি ডলার। ইতোমধ্যে প্রথম প্রজন্মের একদল নবীন উদ্যোক্তা এ খাতে বিনিয়োগ শুরু করে। ফলে পরবর্তী ৫ বছরে রফতানি আয় কয়েক গুণ বাড়ে। ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রফতানি আয় ২২৩ কোটিতে উন্নীত হয়। তারপর থেকে এ খাতকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। যদিও ১৯৯৩-৯৫ সময়ে জিএসপি জালিয়াতির কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) জিএসপি সুবিধা বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল। ১৯৯৬-এর সরকার এর শান্তিপূর্ণ সমাধান করে। তারপর থেকে প্রতি বছর ২০ শতাংশের বেশি হারে বেড়েছে তৈরি পোশাক রফতানি।

বাংলাদেশ চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ মাসে রফতানির মাধ্যমে ১,০২৬ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি আয় হয়েছিল প্রায় ৭২৮ কোটি ডলার। প্রবৃদ্ধি ৪১ শতাংশ।

বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রফতানি প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশ। গত বছর বিশ্ব রফতানিতে ১২ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ ৪১ শতাংশ ধনাত্মক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বরাবরের মতো গত ৬ মাসেও রফতানি আয়ের সিংহভাগ এসেছে তৈরি পোশাক খাত তথা নিট ও ওভেন পোশাক রফতানি থেকে। বিশ্বব্যাপী যখন অর্থনৈতিক মন্দার লু-হাওয়া বইছে, বিশ্ব প্রবৃদ্ধি যখন নিম্নমুখী, বিশ্বের আমদানি-রফতানির পরিমাণ যখন কমছে, খাদ্যপণ্য, জ্বালানি তেলসহ জিনিসপত্রের দাম যখন বাড়ছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়ায় অনেক স্বল্পোন্নত দেশ যখন চাহিদা অনুযায়ী খাদ্য আমদানির সাহস করছে না তখন বাংলাদেশ স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রফতানি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। একটা স্বল্পোন্নত দেশের জন্য এ এক বিরল অর্জন। এর ফলে চলতি অর্থবছর দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬.৭ শতাংশ হবে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিয়েছেন। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিও বেশ স্থিতিশীল। বিশ্বে একমাত্র চীন ও ভারতই এর চেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ২০১০ সালে চীনের প্রবৃদ্ধি ১০.৩ শতাংশ এবং ভারতের প্রবৃদ্ধি ৯.৪ শতাংশ। তারপরও চীন ও ভারতের রফতানি প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম।

গত অর্থবছরে এ খাত থেকে রফতানি আয় হয়েছে ১,২৫০ কোটি ডলার। চলতি ২০১০-১১ অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম ৬ মাসে তৈরি পোশাক খাতে আয় হয়েছে ৭৯৫ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে আয় হয়েছিল ৫৫৯ কোটি ডলার। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪২.২ শতাংশ। আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত গার্মেন্টস খাতের আয়ের সিংহভাগ আসত ওভেন পোশাক তথা শার্ট, ট্রাউজার, স্যুয়েটার প্রভৃতি থেকে। ১৮৯৭-৯৮ অর্থবছর থেকে নিট পোশাক তথা টি-শার্ট, আন্ডারগার্মেন্ট প্রভৃতি থেকে আয় বাড়তে থাকে। একসময় এ আয় ওভেন পোশাকের আয়কে ছাড়িয়ে যায়।

গত অর্থবছরে নিট পোশাক থেকে আয় হয়েছে ৪৩১ কোটি ডলারের বেশি। আর ওভেন পোশাক থেকে এসেছে ৩৬৪ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরের ৬ মাসে নিট পোশাক থেকে এসেছে ৪৩১ কোটি ডলার। আর ওভেন পোশাক থেকে এসেছে প্রায় ৩৬৪ কোটি ডলার। নিট পোশাক তৈরিতে দেশীয় মূল্য সংযোজনের হার ওভেনের তুলনায় বেশি।

যক্তরাষ্ট্র এবং ইইউভুক্ত দেশগুলো বাংলাদেশের প্রধান রফতানি বাজার। এসব দেশে ২০০৮ সাল থেকে মন্দা অব্যাহত থাকায় সহজেই ধরে নেয়া হয়েছিল বাংলাদেশের রফতানি কমবে। মন্দার কারণে সেসব দেশে চাহিদা কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশের রফতানি কমেনি। ২০০৯ সালে রফতানিসহ বাংলাদেশের রফতানি বাজারগুলোতে দামী পোশাকের চাহিদা কমেছে। তাই চীন, মেক্সিকো, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশের তৈরি পোশাক রফতানি কমেছে। জনগণের জীবন মান বৃদ্ধির ফলে এসব দেশে শ্রমের মজুরি বেড়ে গেছে। উন্নত দেশগুলোর মন্দা বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রতিটি দেশেই রফতানি প্রতি বছর বাড়ছে। কানাডা, জাপান, অষ্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, মেক্সিকো প্রত্যেকেরই বাজার চাহিদা বেশি এবং প্রতি বছরই তা বাড়ছে। এসব দেশে ভিয়েতনাম, ভারত, পাকিস্তান প্রভৃতি দেশ প্রচুর রফতানি করছে। আমাদের দরকার এসব দেশের বাজার চাহিদা অনুধাবন করা। আমদানিকারকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপন করা। তাদের সঙ্গে ব্যবসায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলা। তাদের চাহিদা অনুযায়ী পোশাক তৈরি করা। এ জন্য রফতানিকারকদের তৎপরতা আরও বাড়াতে হবে। এসব দেশে ঘন ঘন প্রতিনিধি দল পাঠাতে হবে। আলোচনা-দক্ষতা অর্জন করতে হবে। আমদানিকারক তথা ভোক্তার চাহিদাকে মূল্য দিতে হবে। তাদের চাহিদামতো উৎপাদন করতে হবে। তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রফতানিকারকদের বাজার সম্প্রসারণ প্রচেষ্টায় সরকারের উৎসাহ প্রদান প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করতে হবে। মিশনগুলোকে আরও বাণিজ্যবান্ধব করে তুলতে হবে। তবেই তৈরি পোশাক রফতানি বাজার সম্প্রসারণের যে নবদুয়ার উন্মোচিত হয়েছে তা আরও বিস্তৃত ও চওড়া করা সম্ভব হবে।

সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

SOURCEdailyjanakantha
SHARE

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY