স্বাস্থ্যবিমা চালু করায় একটি পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক অভিবাসন কমেছে। বেড়েছে শ্রমিক উপস্থিতির হার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উদ্যোগ দেশের নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালু করার ক্ষেত্র তৈরি করবে।
গাজীপুরের গিলারচরে ভিনটেজ ডেনিম নামের একটি পোশাক কারখানায় জুলাই মাস থেকে শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প চালু করেছে কর্তৃপক্ষ। বিমার আওতায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক চিকিৎসা-সুবিধা পাচ্ছেন। এই প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় এ কে মেমোরিয়াল হাসপাতাল শ্রমিকদের চিকিৎসা দিচ্ছে। এতে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাজ্যের দাতা সংস্থা ডিএফআইডি। আর কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে ডিএফআইডির একটি প্রকল্প টিজিভিসিআই ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হেলথ কেয়ার ফর ইউ।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হেলথ ইকোনমিকস ইউনিট দেশের সব মানুষের জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালু করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা একাধিক গবেষণা করেছে এবং একটি দিশারি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ইউনিটের মহাপরিচালক মো. আসাদুল ইসলাম ভিনটেজ ডেনিম কারখানায় স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প উদ্বোধন করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘চিকিৎসার খরচ মেটানোর জন্য আগাম অর্থ দেওয়ার সংস্কৃতি এ দেশে গড়ে ওঠেনি। ভিনটেজ ডেনিমের উদ্যোগ আগাম অর্থ দেওয়ার, অর্থাৎ স্বাস্থ্যবিমার ক্ষেত্র তৈরি করবে। এই অভিজ্ঞতা বৃহত্তর পরিসরে কাজে লাগানো যাবে।দেশের কোনো কারখানায় শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবিমা নেই। এই উদ্যোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘শ্রমিকদের স্বার্থে নেওয়া যেকোনো উদ্যোগই ভালো। তবে খাতভিত্তিক উদ্যোগ না নিয়ে একটি কারখানার উদ্যোগ টেকসই হবে না। সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে, সেই উদ্যোগে মালিকদের সঙ্গে সরকারকে থাকতে হবে।’
২০০৮ সাল থেকে জিনসের প্যান্ট তৈরি করছে ভিনটেজ। ইউরোপের ১১টি দেশে তারা পণ্য রপ্তানি করে। কারখানায় শ্রমিক ১ হাজার ৮০০। তাঁদের ৫৫ শতাংশ নারী।
কী লাভ: সেলিম মৃধা আট বছর ধরে এই কারখানায় কাজ করছেন। এখন তিনি অপারেটর পদে কাজ করেন। মাসে বেতন ১০ হাজার টাকা। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ২৮ সেপ্টেম্বর হার্নিয়ায় অস্ত্রোপচার হয়েছে এ কে মেমোরিয়াল হাসপাতালে। তাঁকে একটি টাকাও খরচ করতে হয়নি। বেতন থেকেও কোনো টাকা কাটা হবে না।
প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ) নাহীল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, প্রত্যেক শ্রমিকের একটি পৃথক স্বাস্থ্য কার্ড আছে। সেই কার্ড নিয়ে হাসপাতালে গেলে তাঁরা যেকোনো চিকিৎসাসেবা পাবেন। শুধু তা-ই নয়, শ্রমিকের স্বামী অথবা স্ত্রী এবং ১৮ বছরের কম বয়সী দুটি সন্তান এই সুবিধা পাবে।
টিজিভিসিআইয়ের বাংলাদেশের সমন্বয়ক সজীব সেন প্রথম আলোকে বলেন, একজন শ্রমিক বছরে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকার সুবিধা পাবেন। হাসপাতালে ভর্তি থাকলে দৈনিক শয্যাভাড়া ৫০০ টাকা হিসেবে সর্বোচ্চ তিন দিন থাকতে পারবেন। সাধারণ প্রসবে ৫ হাজার, অস্ত্রোপচার প্রসবে ১৫ হাজার, এমআর সেবায় ৫ হাজার টাকা পাবেন। এ ছাড়া প্রত্যেক শ্রমিকের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য কারখানায় দুজন চিকিৎসক দায়িত্বে থাকেন।
সহযোগী: কারখানা থেকে চার কিলোমিটার উত্তরে মাওনা চৌরাস্তায় বেসরকারি এ কে মেমোরিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন শ্রমিকেরা। হাসপাতালের পরিচালক মো. ছাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে আমরা স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। শ্রমিকেরা শুধু স্বাস্থ্য কার্ড নিয়ে আসবে।’ অন্য দুটি পক্ষ হচ্ছে ভিনটেজ ডেনিম ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হেলথ কেয়ার ফর ইউ।
বিল যাচাইয়ের কাজটি করে হেলথ কেয়ার ফর ইউ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এর মূল কার্যালয় রাজধানীর বনানীতে। প্রতিষ্ঠানটির বিপণন শাখার প্রধান এস এম মনজুরুল আলম বলেন, ‘শ্রমিকেরা চিকিৎসা নিচ্ছে কি না, কোন রোগে কী চিকিৎসা নিচ্ছে, তা আমরা নজরদারি করি। এ ছাড়া হাসপাতাল যে বিল পাঠায়, তা আমরা যাচাই করে দেখি। আমাদের ছাড়পত্র পাওয়ার পর হাসপাতালের বিল পরিশোধ করে কারখানা কর্তৃপক্ষ।’
লাভ মালিকের: পোশাক কারখানা থেকে শ্রমিক চলে যাওয়া নৈমিত্তিক ঘটনা। তবে ভিনটেজ ডেনিমের কারখানা ব্যবস্থাপক খন্দকার হামিদুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কোরবানির ঈদের ছুটির পর ১০ থেকে ১২ শতাংশ শ্রমিক আর ফেরত আসেন না। এ বছর ২ থেকে ৩ শতাংশ শ্রমিক ফেরত আসেননি। এর ফলে শ্রমিক নিয়োগে বাড়তি খরচ হয়নি।
অন্যদিকে শ্রমিকেরা নিয়মিত চিকিৎসাসেবার আওতায় থাকার কারণে তাঁদের উপস্থিতির হারও বেড়েছে বলে কারখানা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে। এর প্রভাব পড়েছে উৎপাদনে। গত বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের তুলনায় এ বছরের একই সময়ে উৎপাদন বেশি হয়েছে।
শ্রমিকেরা কিছু দেন না: মালিকপক্ষ ও বিমা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রমিকেরা স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা নিচ্ছেন, কিন্তু নিজেরা কোনো অর্থ দিচ্ছেন না—এটাই নতুন শুরু হওয়া উদ্যোগের সবচেয়ে দুর্বল দিক। খন্দকার হামিদুল ইসলাম বলেন, প্রায় দেড় বছর আগে স্বাস্থ্যবিমা চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। শ্রমিকদের মধ্যে জরিপ করা হয়। কিন্তু কেউ আগাম টাকা দিতে রাজি নন। পরে সিদ্ধান্ত হয়, মালিকপক্ষ চিকিৎসাব্যয়ের অর্ধেক খরচ করবে আর বাকি অর্ধেক আসবে ডিএফআইডির কাছ থেকে।
হামিদুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকেরা স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা পেতে শুরু করেছেন। এ প্রকল্প আরও এক বছর চলবে। তত দিনে শ্রমিকদের মনোভাবের পরিবর্তন হবে।

VIAprothom-alo
SHARE

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY