RMG News BD
RMG News BD

১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বুর্জোয়া ও সাম্রাজ্যবাদী মহলে দেখা দিয়েছিল বিজয়ের উল্লাস। অন্যদিকে সমাজতন্ত্রী ও সাম্যবাদীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে দেখা দিয়েছিল বিরাট হতাশা। এ দুয়েরই কারণ ছিল অভিন্ন। দুই পক্ষই মনে করেছিল, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের অর্থ ইতিহাস থেকে সমাজতন্ত্রের বিদায়। এ কারণে অনেক সমাজতন্ত্রী ও সাম্যবাদী এর পরও সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের কথা মুখে বলে চললেও তারা মানসিক শক্তি হারিয়ে হয় নানা সুবিধাবাদী পথ গ্রহণ করেছিল, নিজেরা রাজনৈতিকভাবে নিষ্ফ্ক্রিয় হয়েছিল অথবা কোনো বুর্জোয়া পার্টিতে যোগ দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুড়ো বুশ কথিত ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থা’র খেদমতে নিযুক্ত হয়েছিল।

কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের অর্থ ইতিহাস থেকে সমাজতন্ত্রের বিদায় ছিল না। কারণ, সমাজতন্ত্র কোনো জাতীয় ব্যাপার নয়। কোনো জাতির উত্থান-পতনের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের কোনো সম্পর্ক নেই। সমাজতন্ত্র হলো এমন এক সমাজব্যবস্থা, ঐতিহাসিকভাবে যার আবির্ভাব ঘটে পুঁজিবাদের ধ্বংসের মধ্য দিয়ে। এ হিসেবে সমাজতন্ত্র হলো, ঐতিহাসিকভাবে পুঁজিবাদের পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা।

মানবেতিহাসে পুঁজিবাদ এক বিশ্বব্যবস্থা হিসেবে আবির্ভূত হয়ে বিশ্বজুড়ে সংগঠিত হতে লেগেছিল কয়েক শতক এবং যা এখনও বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এখনও আমরা সারাবিশ্বে তার অসম বিকাশই দেখছি। কিন্তু এ বিকাশ অসম হলেও পুঁজিবাদ সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়ে যেমন সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়েছে একশ’ বছরেরও আগে, তেমনি অন্যদিকে বিশ্বের বিপুল অধিকাংশ দেশে এখনও তা অবিকশিত আছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদের ঘেরাও, আক্রমণ, অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা যদি বিশ্নেষণ করা হয় তাহলেই বোঝা যাবে, কেন এ পতন ঘটেছিল এবং এখন এটা বোঝার অসুবিধা হবে না যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের অর্থ ইতিহাস থেকে সমাজতন্ত্রের বিদায় নয়। সমাজতন্ত্রের কোনো আত্যন্তিক ত্রুটি বা দুর্বলতার কারণে এ পতন ঘটেনি।

অক্টোবর বিপ্লবের পর থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়ন সাম্রাজ্যবাদীদের আক্রমণের মুখে ছিল। সরাসরি সামরিক আক্রমণের সম্ভাবনা, অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা, ঘেরাও অবরোধের কারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে যে ভেঙে পড়তে পারে, এ আশঙ্কা লেনিনের ছিল। কারণ এসব তৎপরতা দেশের অভ্যন্তরে এমন সব শর্ত তৈরি করে, যা সমাজতান্ত্রিক নির্মাণকে রোধ করতে না পারলেও তার ফলে সমান্তরালভাবে পুঁজিবাদী ধ্যান-ধারণা, প্রবণতা, অভ্যাস-আচরণ ও সম্পর্কের জন্মদান করে। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই এগুলো বিকশিত হয়ে পুঁজিবাদের পুনরুত্থানের পথ প্রশস্ত করে। সোভিয়েত ইউনিয়নেও এই প্রক্রিয়া প্রথম থেকেই শুরু হয়েছিল। যদি সোভিয়েত ইউনিয়ন এভাবে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর, বিশেষত ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের আক্রমণের মুখোমুখি না হতো, তাদের দ্বারা ঘেরাও না হতো, তাহলে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিকাশ যেভাবে ঘটত, যেভাবে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার নিয়ম-কানুন, রীতিনীতি সব ক্ষেত্রে অবাধে প্রচলিত হতে পারত, সেটা হতে পারেনি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মূল কারণ ছিল সেটাই। কিন্তু এ বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ওপর কোনো গবেষণামূলক কাজ প্রকৃতপক্ষে না হওয়ায় এ ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকা আড়ালে রেখে শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর আলোচনা হলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতার শক্তিশালী ভূমিকা তার যথার্থ পরিপ্রেক্ষিতে বিচার-বিশ্নেষণ না করার ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির অবনতির জন্য সমাজতন্ত্রকেই দায়ী করা হয়েছে, সমাজ ব্যবস্থা হিসেবে সমাজতন্ত্র যে অকার্যকর ও বাতিলযোগ্য- এই ধারণাই সৃষ্টি হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন যে সমাজতন্ত্রের পতন বা ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বব্যবস্থা হিসেবে তার বিদায় নয়- এ বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য প্রয়োজন অক্টোবর বিপ্লবের পর সাম্রাজ্যবাদ কীভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক নির্মাণ চলতে থাকার সঙ্গে সমান্তরালভাবে সেখানে পুঁজিবাদী শক্তির বিকাশ ঘটিয়েছিল। যেগুলো চিহ্নিত করা, এ বিষয়ের ওপর গুরুত্বপূর্ণ অনেক গবেষণা করা। ত্রুক্রশেভ আকাশ থেকে পড়েননি। সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে সৃষ্ট পুঁজিবাদী প্রক্রিয়াই স্ট্যালিনের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক নির্মাণের বিশাল কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকার সময়ই তার শর্ত তৈরি করেছিল।

আগেই বলেছি, একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন যে ধ্বংস হতে পারে, এ আশঙ্কা লেনিনের ছিল। তিনি তার অনেক লেখাতেই এ বিষয়ে বলেছেন। এক মার্কিন সাংবাদিকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের সময় তিনি বলেছিলেন, ‘রাশিয়ার পশ্চাৎপদতার কারণে অথবা বিদেশি শক্তির দ্বারা আমরা রাশিয়া থেকে উৎখাত হতে পারি; কিন্তু রাশিয়ার বিপ্লবের আদর্শ রাজনৈতিকভাবে সমাজ নিয়ন্ত্রণের বিশ্বের তাবৎ ব্যবস্থাকে ভাঙবে এবং ধ্বংস করবে।’ ‘বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের এই তাবৎ ব্যবস্থা’ বলতে তিনি পুঁজিবাদকেই বুঝিয়েছিলেন। এর মর্মার্থ এই যে, সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের আক্রমণের মুখে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র উৎখাত হলেও অক্টোবর বিপ্লবের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক আদর্শ ঐতিহাসিকভাবে ঘোষিত হয়েছিল, সে আদর্শের উৎখাত তো হবেই না, উপরন্তু তার দ্বারা বিশ্বে পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদই ধ্বংস হবে। এটাই ঐতিহাসিকভাবে পুঁজিবাদের অপ্রতিরোধ্য পরিণাম।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকেই ‘সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কী’- এই প্রশ্ন জোরালোভাবে আলোচিত হতে থাকে। আমি নিজে এই প্রশ্নের জবাবে পাল্টা প্রশ্ন করি- ‘পুঁজিবাদের ভবিষ্যৎ কী?’ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুড়ো বুশ খুব উৎফুল্ল হয়ে পুঁজিবাদকে ঘোষণা করেছিলেন ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থা’ হিসেবে। এর থেকে হাস্যকর ঘোষণা আর কী হতে পারত? কারণ পুঁজিবাদ তো কোনো ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থা’ নয়। এ বিশ্বব্যবস্থা কয়েক শতক ধরে সারা দুনিয়ায় জারি থেকে দেশে দেশে জনগণের ওপর চরম শোষণ-নির্যাতন চালিয়ে এসে দুনিয়াকে দেখিয়ে দিয়েছে যে, এই ‘বিশ্বব্যবস্থায়’ কিছু লোক ভালো থাকবে; কিন্তু তাদের ভালো থাকার মূল্য দিতে হবে যে কোনো সমাজের বিপুল অধিকাংশ মানুষকে- যারা শ্রমজীবী, যারা গরিব এবং যাদের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা বলে কিছু নেই। এই ‘বিশ্বব্যবস্থার’ অধীনে শুধু যে প্রত্যেক জাতিরাষ্ট্রের মধ্যেই বৈষম্য স্থায়ী করার ব্যবস্থা থাকে, তাই নয়। তারা দুনিয়ার পশ্চাৎপদ দেশগুলোকেও লুণ্ঠন করে সেসব দেশে জনগণের ওপর নির্যাতনের মাত্রা অসহ্য করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনকে হটিয়ে দিয়ে বিশ্বের সর্বপ্রধান ও সব থেকে শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তার পর দশকের পর দশক ধরে বিশ শতকের শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে তারা অপ্রতিহত থাকে। তাদের এই অবস্থার দিকে তাকিয়েই মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুড়ো বুশ স্পর্ধিতভাবে ঘোষণা করেছিলেন তাদের সাম্রাজ্যবাদী ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থা’। শত শত বছরের এই ব্যবস্থাকে ‘নতুন’ বলার অর্থ ছিল, এখন থেকে সাম্রাজ্যবাদের প্রতিদ্বন্দ্বী সমাজতন্ত্র বলে আর কিছু থাকবে না। তারাই একচ্ছত্রভাবে তাদের পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হবে। কিন্তু বাস্তবত তা হয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর নতুন করে কোনো দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে পুঁজিবাদ উৎখাত না হলেও এটা এখন অস্বীকার করার উপায় নেই যে, পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বলে আর কিছু নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেভাবে পরাশক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাপট বিশ্বব্যাপী ছিল, তা আর নেই। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থার দিকে তাকালেই এটা বোঝার অসুবিধা হবে না। তিনি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে রক্ষা করার জন্য আওয়াজ দিয়েছেন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’। এই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ আওয়াজ থেকে বোঝা যায়, সাম্রাজ্যবাদীদের যে ঐক্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেখা দিয়েছিল, তা আর নেই। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ আওয়াজ সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বে আমেরিকার বিচ্ছিন্নতার বিষয়টিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

দেশে দেশে এখনও পুঁজিবাদী শাসন বজায় থাকলেও আন্তর্জাতিক পুঁজি, করপোরেট হাউসগুলো যেভাবে পুঁজির কেন্দ্রীভবন ঘটিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিয়ে ইউরোপীয়, জাপানি পুঁজিবাদী জাতীয় রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব খর্ব করছে, তার ফলে পুঁজিবাদের আপাত রমরমা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণভাবে পুঁজিবাদ ধ্বংস করার শর্তই তৈরি হচ্ছে। জনগণ এখনও অসংগঠিত। বিপ্লবী শক্তির নতুন উত্থান ঘটছে না; কিন্তু পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে শাসকশ্রেণির দ্বন্দ্ব এবং জনগণের ওপর তাদের নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি হতে থাকার মধ্যেই দুনিয়াজুড়ে বিপ্লবী শক্তির সংগঠিত বিকাশের শর্ত তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে অবস্থায় আছে, তার সঙ্গে বিশ শতকের আইজেন হাওয়ার, ডালেসের যুগের অবস্থার তুলনা করলে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা করুণই বলতে হবে। এই করুণ অবস্থা লেনিনের ভাষায় পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তরে দেখা যাচ্ছে। সর্বোচ্চ স্তরে এই অবস্থা দেখা দিলে বর্তমান পর্যায়ে পুঁজিবাদের অবস্থা সাধারণভাবে যে আসলে শোচনীয়, এই সত্য চাপা দিয়ে রাখার কোনো সুযোগ নেই। প্রকৃতপক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো তাদের ওপর নির্ভরশীল পশ্চাৎপদ ও অনুন্নত মক্কেল রাষ্ট্রগুলোসহ (client state) যে সমাধান উত্তীর্ণ সংকটে অদূর ভবিষ্যতেই নিক্ষিপ্ত হবে, এতে সন্দেহ নেই। কাজেই অক্টোবর বিপ্লবের শতবর্ষ পার হওয়ার পর এখন ‘সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কী?’ এ নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই। পুঁজিবাদ এখন বিশ্ব পরিসরে তার বর্তমান রমরমা অবস্থা সত্ত্বেও ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। তার ধ্বংস অনিবার্য এবং পুঁজিবাদের পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা হিসেবে মানবজাতি সমাজতন্ত্রের থেকে উন্নততর কোনো ব্যবস্থা আবিস্কার করেনি। কাজেই পুঁজিবাদের ধ্বংস যেমন অনিবার্য, তেমনি অনিবার্য বিশ্বব্যবস্থা হিসেবে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। এটা এখন শুধু সময়ের ব্যাপার।

SOURCESamakal
SHARE

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY