এ ছবিটির সঙ্গে শিক্ষিত তরুণ সমাজের বেশিরভাগই কমবেশি পরিচিত। সমবয়সী তিন কিশোর মুক্তিযোদ্ধার ছবি। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক অনুষ্ঠান, বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবসকেন্দ্রিক নানা অনুষ্ঠানÑ এমনকি পাঠ্যবইয়েও ছবিটি ব্যবহার করা হয়। এক কিশোর লক্ষ্যবস্তুতে গ্রেনেড ছুড়ছে। অন্য দুজন লক্ষ্যবস্তুর দিকে বন্দুক তাক করে আছে। এটি কোনো মেকি ছবি নয়। ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে পাকসেনাদের একটি শক্ত ঘাঁটির বাংকার ধ্বংসের চিত্র। যুদ্ধ চলাকালীনই মানিকগঞ্জের নাইব উদ্দিন নামে এক ফটোগ্রাফার ছবিটি ক্যামেরায় ধারণ করেন। সারা বিশ্বে আলোড়ন তোলে ছবিটি। দেশ-বিদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক হিসেবে স্থান পায়। মুক্তিযুদ্ধে জীবনবাজি রাখলেও জীবনযুদ্ধে তারা প্রত্যেকেই পরাজিত সৈনিক। জোটেনি কোনো খেতাবও। সারা জীবন রিকশা চালিয়ে জীবন নির্বাহ করেন। মজিবর রহমান শেষ পর্যন্ত আক্রান্ত হন ক্যানসারে। অবশেষে একপ্রকার বিনা চিকিৎসায় মারা যান।টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার এলাসিন ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম মুশুরিয়া। অদম্য তিন কিশোরের বাড়ি এ গ্রামে। গ্রেনেড ছুড়তে থাকা আবদুল খালেক, রাইফেল হাতে আবদুুল মজিদ ও বাঁয়ে মজিবর রহমান। দেশমাতৃকার টানে যুদ্ধের সময় বাড়ি ছাড়েন। একসময় গ্রামের মানুষের কাছে খবরও আসে তারা শহীদ হন। তবে যুদ্ধের অনেক পর ১৯৭২ সালের শেষ দিকে তারা বাড়ি ফিরেন। স্বাধীন দেশে বসবাস করেছেন এতেই তাদের প্রশান্তি। তবে শেষ জীবনে একটু সম্মান আর দুই মুঠো খাবার পেলেই সন্তুষ্টি তাদের।

সম্প্রতি আমাদের সময়ের সঙ্গে কথা হয় দুই বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং অপরজনের পরিবারের সদস্যের সঙ্গে।মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমান জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রিকশা চালিয়েছেন। সঞ্চয় বলতে কিছুই ছিল না। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ২০১৪ সালে। জোটেনি কোনো চিকিৎসা কিংবা সরকারি সাহায্য। পরিবারের শেষ সম্বল বলতে যা ছিল তাও চিকিৎসার পেছনে ব্যয় করা হয়। এখনো সংসারে রয়েছেন স্ত্রী সাহাতন ও ছেলে রুবেল।মজিবর রহমানের ছেলে রুবেল মিয়া আক্ষেপের সুরে বলেন, বাবা মারা গেছেন ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে। টিউমার থেকে ক্যানসার। যে সম্পত্তি ছিল তা বিক্রি করে এই চিকিৎসা করানো হয়েছিল। ভাতা পাচ্ছেন ১০ হাজার টাকা। চিকিৎসার খরচ ও অন্য কাজে চালানোর জন্য লোন আনা হয়েছিল ৩ লাখ টাকা। প্রতিমাসে ৭ হাজার টাকার ওষুধ লাগত। আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। কিন্তু ৩৪ বছর রিকশা চালিয়েছেন। অনেক কষ্টে মারা গেছেন। আমরা ভালো চিকিৎসা করাতে পারিনি। সব কিছু বিক্রি করেছি তার চিকিৎসার পেছনে। তখন কেউ খবর নিতে আসেনি। এখনো আসে না। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, অনেকেই মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করে সম্পদের পাহাড় গড়ছেন। কিন্তু আমাদের তিন বেলা খাবার জুটাতেই কষ্ট করতে হচ্ছে।আবদুল খালেকের অবস্থাও একই রকম। কাজ করতেন অটবিতে। ব্যবসায়িক অবস্থা মন্দা থাকায় বকেয়া পড়ে বেতন। বৃদ্ধ হয়ে যাওয়ায় শক্তিও পান না। তাই চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। ছোট্ট একটি ভাঙা ঘর। সন্তানদের সংসারেও টানাপড়েন। আলাদা সংসার পেতেছেন চার ছেলেমেয়ে। সরকারি ভাতার ওপর নির্ভর করেই তার জীবন চলে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রায় আড়াইশ কবিতা লিখেছেন আবদুল খালেক। অর্থের অভাবে সেগুলো প্রকাশ করা হয়ে ওঠেনি।আবদুল খালেক বলেন, যখন যুদ্ধ করি তখন আমার বয়স ১৪ বছর। ক্লাস সেভেনে পড়তাম। পাকিস্তানিদের অত্যাচারের মাত্রা দেখে আর ঠিক থাকতে পারিনি। হাতে তুলে নিয়েছিলাম অস্ত্র। মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ করলেও জীবনযুদ্ধে আজ পরাজিত। তিনি বলেন, আমার ৩ ছেলে ১ মেয়ে। সব ছেলেমেয়েই পড়াশোনা করে। সরকারি ভাতা হিসেবে প্রতিমাসে ১০ হাজার টাকা পাই। শুনেছি খিলক্ষেতে আমাদের ভাস্কর্য করা হয়েছে। এর বাইরে বই-পুস্তকে আছি। কিন্তু বাস্তবে নেই। জেলা প্রশাসকের কাছে খাসজমির জন্য আবেদন করেছি। কিন্তু তাও দেননি। প্রতিমাসে প্রায় ২ হাজার টাকার ওষুধ লাগে। ভিটাবাড়ি ছাড়া আর কিছুই নেই। জীবনের এ প্রান্তে এসে একটু সম্মান আর দুই মুঠো খেয়ে বাঁচতে চাই।বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধাদের লম্বা তালিকা দেখে বিস্ময় ও আর হতাশা প্রকাশ করেন তিনি বলেন, তখন যদি সত্যি এত মুক্তিযোদ্ধা থাকত, তা হলে দেশ শত্রুমুক্ত হতে ইন্ডিয়া-রাশিয়ার সাহায্যের প্রয়োজন হতো না। এ মুক্তিযোদ্ধার বাড়িতে রয়েছে ছোট্ট একটি ভাঙা ঘর। সেখানে সযতেœ রেখেছেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিময় নিদর্শন। তার স্বপ্ন একদিন লেখা কবিতাগুলো বই আকারে প্রকাশিত হবে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিময় নিদর্শনগুলো দিয়ে গড়ে তোলা হবে জাদুঘর।অপর বীরযোদ্ধা আবদুুল মজিদ। আনসার পদে চাকরি করছেন। সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করতে পারেননি দরিদ্রতায়। জীবনের বেশিরভাগ সময়েই কারখানা শ্রমিক আবার কখনো নৌকার মাঝি হিসেবে কাজ করেছেন। পরে আনসার পদে চাকরি পেলেও সন্তানরা বড় হয়ে যাওয়ায় উচ্চশিক্ষিত করার সুযোগ পাননি।আবদুল মজিদ এ বিষয়ে বলেন, বর্তমানে এলপিআরে আছি। ১০ হাজার টাকা মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাই। এর বাইরে কখনো কিছু পাইনি। এক ছেলে মারা গেছে। তিন মেয়ে। বাবা-দাদার সম্পত্তি বলতে কিছুই নেই। যখন মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করি, তখন বয়স ছিল ১৬ বছর। পরিবারের সদস্যদের নিজের বীরত্বগাথার গল্প বলতে ভালো লাগে। পরিবারের সদস্যরাও খুশি হয়। কিন্তু জীবনযুদ্ধে পরাজিত বিষয়টি ভাবতে কষ্ট হয়। তবুও স্বাধীন দেশে বসবাস করছিÑ এটিই আমাদের কাছে বড় তৃপ্তি। তিনি বলেন, ভাতার বাইরে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা সরকার দিচ্ছে, তার কিছুই তেমন পাই না।১৩-১৬ বছরের সমবয়সী এ তিন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা ৭১ সালের মে মাসের শেষের দিকে মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশে এলাকা ছাড়েন। ২১ বন্ধু মিলে নৌকাযোগে চলে যান ভারতের মাইনকারচরে। সেখান থেকে তুরা ক্যাম্পে গেরিলা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হন। এর পর ফিরে আসেন দেশে। কিছু দিন পর সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে শুরু করে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ। একাত্তরের ৪ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনীর সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে নামেন। তারা শুধু পাকসেনাদের ওপর গুলিবর্ষণই নয়, ধ্বংস করেন তাদের বেশ কয়েকটি ঘাঁটি। তারই একটি প্রতিচ্ছবি আলোচিত ছবিটি।এ বিষয়ে জানতে চাইলে দেলদুয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, এমন অসম সাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। তাদের সম্মান জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তিনি বলেন, ছবির তিন মুক্তিযোদ্ধা দেলদুয়ার তথা বাংলাদেশের গর্ব। এ বছর বিজয় দিবসে আমরা জীবিত দুই মুক্তিযোদ্ধাকে বিশেষভাবে সম্মানিত করব। সেখানে মারা যাওয়া অপর বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের সদস্যও উপস্থিত থাকবেন। সরকারিভাবে যাতে তাদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়, আরও বেশি সম্মানিত করা হয়, সে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন মহলের দৃষ্টিগোচরে আনার জন্যও কাজ করব বলেও জানান তিনি।

SOURCEDainik Amader Shomoy
SHARE

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY